মাহাবুব রহমান বিপ্লব, বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত ৪ঠা আগস্ট বদরগঞ্জের ইতিহাসে এক অসামান্য অধ্যায় রচিত হয়েছিল। মূল ধারার গণঅভ্যুত্থানে সারাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক এক দিন আগেই বদরগঞ্জে স্থানীয় আওয়ামীলীগ সরকারের স্থানীয় ক্ষমতাসীন চৌধুরী পরিবারের কার্যত পতন ঘটেছিল ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধের মুখে।
সকাল ১১টা: মুখোমুখি অবস্থান ও সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনার সূত্রপাত সকাল ১১টার দিকে। একদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে, অন্যদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও রাজপথে মিছিল নিয়ে নামে। একপর্যায়ে বদরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন ও জীতেনদত্ত মঞ্চের নিকটবর্তী এলাকায় শিক্ষার্থীরা পৌঁছালে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
এ ঘটনার দৃশ্য নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করছিলেন দৈনিক ‘আমাদের সময়’-এর বদরগঞ্জ প্রতিনিধি বিপ্লব সরকার। বিষয়টি নজরে এলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তার ওপর চড়াও হয়। হামলাকারীরা জোরপূর্বক তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিয়ে পাকা সড়কের ওপর আছাড় দিয়ে চুরমার করে দেয়।
বেলা ১২টা: সংঘর্ষ ও চৌধুরীদের বাড়ীতে আশ্রয় সাংবাদিকের ওপর হামলা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ফুঁসে ওঠে সাধারণ জনতা। ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে এলে বেলা ১২টার দিকে উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হয় তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘাত। সাধারণ মানুষের প্রতিরোধে টিকতে না পেরে একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় ক্ষমতাসীন ‘চৌধুরী বাড়ি’তে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
অগ্নিসংযোগ ও নেতাদের পলায়ন: উত্তাল জনতা চৌধুরী বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো উপজেলায়। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা একে একে বদরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য ডিউক চৌধুরী , পৌর মেয়র টুটুল চৌধুরী এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুইট এর বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করে। কেবল বাড়িঘরই নয়, চৌধুরী বাড়ির ভিতরে রাখা নেতাদের একাধিক প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল টেনে রাস্তায় এনে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতের বাইরে চলে গেলে চৌধুরী বাড়ির পেছনের উঁচু সীমানা প্রাচীর লাফিয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে যান পৌর মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। এর মাধ্যমেই ওই দিন বদরগঞ্জে তাদের আধিপত্যের চূড়ান্ত অবসান ঘটে।
মামলা নাটক ও পটপরিবর্তন: ৪ আগস্ট রাতের আঁধারে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রায় তিনশজনকে অভিযুক্ত করে বদরগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ বা এজাহার দেওয়া হয়েছিল। তবে তার পরদিনই—অর্থাৎ ৫ই আগস্ট—শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ায় এবং আইনি জটিলতা ও বিক্ষুব্ধ জনরোষের ভয়ে পুলিশ পরবর্তীতে সেই অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করেনি। ফলে পুলিশি হয়রানি ও মামলার হাত থেকে রক্ষা পায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা।
স্থানীয়দের মতে, ৫ই আগস্ট সারাদেশে কেন্দ্রভিত্তিক বিজয় আসলেও, বদরগঞ্জের সচেতন ছাত্র-জনতা নিজেদের সাহসিকতা দিয়ে তার একদিন আগেই—অর্থাৎ ৪ঠা আগস্টেই—এ উপজেলায় আওয়ামী লীগের ভিত্তি ভেঙে দিয়েছিল। এদিকে পতনের তিন বছর ধরে স্থানীয় এমপি ডিউক চৌধুরী মেয়র টুটুল চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান সুইট সহ চৌধুরী পরিবারের স্ত্রী সন্তান সহ সকলে পলাতক রয়েছে, তাদের কে পুলিশ গ্রেফতার এড়াতে স্থানীয় আওয়ামিলীগের ইউনিয়ন পর্যায়ের চুনোপুঁটি নেতাদের গ্রেফতার দেখিয়ে নাম ওয়াস্তে দায়িত্ব পালন করে, অপরদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠন শীর্ষ নেতা ও থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে নাকের ডগায় উপর দিয়ে শেখ হাসিনার পতনের পরও তিন ধরে এলাকায় বসবাস ও প্রকাশ্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন আওয়ামিলীগ থেকে তিনবার নির্বাচিত মেয়র ও পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি উত্তর কুমার সাহা, তিনি গোপনে স্থানীয়ভাবে আওয়ামীলীগকে সাংগঠনিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে পলাতক নেতাদের ফিরে আনতে তৎপরতা চালিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
Reporter Name 


















