আশরাফ খান কিরণ রংপুর।। রংপুর মহানগরীর সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান ২৩ মাস থেকে প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। এই জটিলতায় আটকে পড়েছে নবম ও একাদশ শ্রেণির ২শ জন শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পটপরিবর্তনের পরে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অধ্যক্ষের অনিয়মের বিষয়ে বিচার চাওয়া হলে, অভিযুক্ত অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট হতে এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছা. শহিদা আক্তার বানু ২৫ আগস্ট হতে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেন।
অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান মোবাইল ফোনে বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানে যান। তবে প্রতিষ্ঠানটি নষ্ট করি ফেলছে মুকুল মাস্টারসহ কিছু স্থানীয়রা এমন কথাও বলেন অধ্যক্ষ শাহজাহান । রংপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. এনায়েত হোসেন বলেন, সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহজাহান চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী ঘটনার জন্য দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিলেন। সর্বশেষ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অধ্যক্ষ মো. শাহজাহানকে স্বীয় পদে বহাল করা হয়। যদি প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে থাকে সেটি আমরা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। শিক্ষার্থীরা কেন উপবৃত্তি পায়নি। এর পেছনে কাদের গাফিলতি রয়েছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রংপুরের বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) খৃষ্টফার হিমেল রিছিল বলেন, অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
এদিকে দীর্ঘ সময় প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতে ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর মো. আ.ত.ম মকছুদার রহমানকে (দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক) দায়িত্ব প্রদান করেন রংপুরের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল মান্নান। মাকছুদার রহমান ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল অবসরে গেলে কিছুদিন সিনিয়র শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। ওই বছরের ২৬ অক্টোবর সিরাজুল ইসলাম দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশের পরে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সাঈদ প্রতিষ্ঠানটির অফিস কক্ষে সিনিয়র শিক্ষক মো. মোস্তফা জামানকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব প্রদান করে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ চলতি বছরের ১৮ মে এক পত্রের মাধ্যমে ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখ হতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা জামানকে অব্যাহতি দিয়ে অধ্যক্ষ মো. শাহজাহানকে দায়িত্বে পুনরায় বহাল করেন। ওই পত্রে উল্লেখ করা হয় গত ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভায় নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওই পত্র অনুযায়ী গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শিক্ষা ও কল্যাণ শাখার স্মারকমূলে অধ্যক্ষ শাহজাহান ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ২৪ মার্চ ২০২৫ তারিখে অধ্যক্ষ শাহজাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী ১৮০ দিন অতিবাহিত হওয়ায় উক্ত শিক্ষক স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বীয়পদে বহাল হওয়ায় অধ্যক্ষ মো. শাহজাহানকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারপূর্বক স্বীয়পদে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং মোস্তফা জামানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে অধ্যক্ষ শাহজাহানের বিরুদ্ধে হওয়া তদন্ত প্রতিবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সেই প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত অধিদপ্তরে পাঠানো হয়নি। তবে ম্যানেজিং কমিটিতে থাকা স্কুলের শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা জামানের দাবি, অধ্যক্ষ শাহজাহান প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থেকে অনুপস্থিত অবস্থায় আছেন। কোনো মিটিংয়েই তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত বা পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত হয়নি। অপরদিকে প্রতিষ্ঠানের সারে তিন কোটি টাকা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অধ্যক্ষ শাহজাহানের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তফা জামান। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, অনেকে উপবৃত্তির টাকা পেলেও আমরা উপবৃত্তির টাকা পাইনি। এজন্য স্যারদের কাছে গিয়েছিলাম। তারা বলছেন কলেজের অধ্যক্ষ পাসওয়ার্ড নিয়ে রাখার কারণে তারা সাবমিট করতে পারে নাই। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তফা জামান বলেন, গত বছরের ২৬ অক্টোবর মিনিস্ট্রি অডিটের সময় আমাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। চলতি বছরের ১৮ মে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র শিক্ষক সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে পাঠানো এক পত্রে জানতে পারি আমাকে অব্যাহতি প্রদান করে অধ্যক্ষ শাহজাহানকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এরপরে প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান না করে অনুপস্থিত থেকেই এমপিওসহ সব ধরনের পাসওয়ার্ড নিজের কাছে নিয়ে অধ্যক্ষ শাহজাহান আমার ঈদুল আজহার উৎসব ভাতা ও বেতন সাবমিট করে নাই। গত ২ মাস থেকে কোন কারণ ছাড়াই আমার বেতন বন্ধ করে রাখছে অনুপস্থিত থাকা অধ্যক্ষ। আজ পর্যন্ত আমি জানি না কি কারণে আমার বেতন ভাতা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এবিষয়ে আমি উপজেলা শিক্ষা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েছি। এখন পর্যন্ত আমি কোন সমাধান পাইনি। তিনি আরও বলেন, এছাড়া অনুপস্থিত অধ্যক্ষের কাছে পাসওয়ার্ড থাকায় ষষ্ঠ, নবম ও একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির ফরম যথাসময়ে সাবমিট করতে না পারায় ২০০ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি বঞ্চিত হয়েছে।
Reporter Name 









