5:38 am, Friday, 6 November 2026

দুই পা ও এক হাতের সক্ষমতা হারিয়েও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন রেজাউলের

  • Reporter Name
  • Update Time : 06:05:02 am, Tuesday, 3 November 2026
  • 69 Time View

মিরাজ ই মোস্তফা স্টাফ রিপোর্টার ।।প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন রেজাউলের। দুই পা ও এক হাতের স্বাভাবিক সক্ষমতা হারিয়েও থেমে থাকেননি। গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার গড়ে বিয়ে করে সংসার সাজাতে চান ৩৪ বছর বয়সী রেজাউল।
জীবন সব সময় মানুষের ইচ্ছেমতো চলে না। কখনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, কখনো বাস্তবতার কঠিন পরিস্থিতি মানুষের সামনে তৈরি করে নানা বাধা। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রত্যয় থাকলে প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখা যায়। তেমনই এক স্বপ্নবাজ মানুষ দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার রেজাউল করিম (৩৪)। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনের স্বাভাবিক গতিকে থামিয়ে দিতে পারেনি। দীর্ঘ দুই দশক ধরে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জীবনযাপন করে এখন তিনি গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার গড়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বিয়ে করে সুন্দর একটি সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখছেন।
রেজাউল করিম উপজেলার ৪ নম্বর পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গাপুর শালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর পিতা আহাদ আলী এবং মাতা শেফালী বেগম। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের বড় সন্তান। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জন্মের মাত্র তিন মাস পর অসুস্থ হয়ে পড়েন রেজাউল। সে সময় ভুল চিকিৎসার কারণে তাঁর শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তিনি দুই পা ও এক হাতের স্বাভাবিক সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি শ্রবণ ও বাকশক্তি থেকেও বঞ্চিত হন।
তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর কর্মস্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রায় ২০ বছর ধরে নিজের সামর্থ্য ও প্রচেষ্টায় ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে আসছেন তিনি। পরিবারের বিভিন্ন কাজেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। খড়ি কাটা, গবাদিপশু পালন, রান্নাবান্নাসহ ঘরের নানা কাজে তিনি সহযোগিতা করেন। পরিবারের সদস্যদের মতে, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে রেজাউল আরও অনেক কিছু করতে পারবেন।
রেজাউলের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব না হলেও ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাঁর মনের কথা জানার চেষ্টা করেন প্রাইম নিউজ২৬-এর স্টাফ রিপোর্টার। ইশারা ভাষায় রেজাউল জানান, তাঁর স্বপ্ন নিজের একটি গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার গড়ে তোলা। এ খামারের মাধ্যমে নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করে নিজেকে স্বাবলম্বী করতে চান তিনি। পাশাপাশি বিয়ে করে একটি সুন্দর সংসার গড়ে সমাজে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করতে চান। তাঁর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রাথমিক পুঁজি, পশু কেনার সহযোগিতা, খামার স্থাপনের উপযুক্ত ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।
রেজাউলের ছোট বোন শামীমা খাতুন বলেন, “জন্মের পর থেকেই আমার বড় ভাইকে এ অবস্থায় দেখে আসছি। তাঁর জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছি। এ কারণেই গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পরও অন্য কোনো চাকরিতে না গিয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছি। দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে কাজ করে যাচ্ছি। আমি চাই, রেজাউলের মতো মানুষগুলোও সমাজে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার সুযোগ পাক।”
রেজাউলের মা শেফালী বেগম বলেন, “আমার ছেলের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের যদি সমাজ একটু সুযোগ ও সহযোগিতা করে, তাহলে তারাও অনেক ভালো কিছু করতে পারে। আমার ছেলে ঘরের অনেক কাজ করতে পারে। খড়ি কাটা, গবাদিপশু পালন, রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন কাজে সে আমাদের সহযোগিতা করে। আমি চাই, আমার ছেলে নিজের মতো করে কিছু করুক, স্বাবলম্বী হোক এবং একটি সুন্দর জীবন গড়ে তুলুক।”
রেজাউলের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো মানুষের স্বপ্ন দেখার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। একজন মানুষের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারিত হয় তাঁর ইচ্ছাশক্তি, কর্মস্পৃহা ও সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত পরিবেশ, কর্মসংস্থানের সুযোগ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক সহযোগিতা।
রেজাউলের প্রত্যাশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষ তাঁর পাশে দাঁড়াবেন। বিশেষ করে গরু, ছাগল ও ভেড়ার একটি ছোট খামার গড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হলে নিজের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যতে পরিবারের দায়িত্বও নিতে পারবেন তিনি।
হয়তো কারও সামান্য সহযোগিতা রেজাউলের জীবনে বয়ে আনতে পারে নতুন সম্ভাবনা। তাঁর স্বপ্ন শুধু কয়েকটি গবাদিপশুর খামার গড়ে তোলা নয়; তাঁর স্বপ্ন নিজের উপার্জনে বাঁচা, আত্মমর্যাদা নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং বিয়ে করে ভালোবাসায় ভরা একটি সংসার গড়ে তোলা। সমাজের মানবিক মানুষগুলোর একটু সহযোগিতাই হতে পারে তাঁর স্বপ্নপূরণের প্রথম সিঁড়ি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Prime News 26

দিনাজপুর দুর্গাপূজা মন্ডপ পরিদর্শনে হুইপ মোঃ আখতারুজ্জামান মিয়া

অভিবাসন গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে: স্পিকার

দুই পা ও এক হাতের সক্ষমতা হারিয়েও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন রেজাউলের

Update Time : 06:05:02 am, Tuesday, 3 November 2026

মিরাজ ই মোস্তফা স্টাফ রিপোর্টার ।।প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন রেজাউলের। দুই পা ও এক হাতের স্বাভাবিক সক্ষমতা হারিয়েও থেমে থাকেননি। গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার গড়ে বিয়ে করে সংসার সাজাতে চান ৩৪ বছর বয়সী রেজাউল।
জীবন সব সময় মানুষের ইচ্ছেমতো চলে না। কখনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, কখনো বাস্তবতার কঠিন পরিস্থিতি মানুষের সামনে তৈরি করে নানা বাধা। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রত্যয় থাকলে প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখা যায়। তেমনই এক স্বপ্নবাজ মানুষ দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার রেজাউল করিম (৩৪)। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনের স্বাভাবিক গতিকে থামিয়ে দিতে পারেনি। দীর্ঘ দুই দশক ধরে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জীবনযাপন করে এখন তিনি গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার গড়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বিয়ে করে সুন্দর একটি সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখছেন।
রেজাউল করিম উপজেলার ৪ নম্বর পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গাপুর শালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর পিতা আহাদ আলী এবং মাতা শেফালী বেগম। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের বড় সন্তান। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জন্মের মাত্র তিন মাস পর অসুস্থ হয়ে পড়েন রেজাউল। সে সময় ভুল চিকিৎসার কারণে তাঁর শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তিনি দুই পা ও এক হাতের স্বাভাবিক সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি শ্রবণ ও বাকশক্তি থেকেও বঞ্চিত হন।
তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর কর্মস্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রায় ২০ বছর ধরে নিজের সামর্থ্য ও প্রচেষ্টায় ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে আসছেন তিনি। পরিবারের বিভিন্ন কাজেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। খড়ি কাটা, গবাদিপশু পালন, রান্নাবান্নাসহ ঘরের নানা কাজে তিনি সহযোগিতা করেন। পরিবারের সদস্যদের মতে, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে রেজাউল আরও অনেক কিছু করতে পারবেন।
রেজাউলের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব না হলেও ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাঁর মনের কথা জানার চেষ্টা করেন প্রাইম নিউজ২৬-এর স্টাফ রিপোর্টার। ইশারা ভাষায় রেজাউল জানান, তাঁর স্বপ্ন নিজের একটি গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার গড়ে তোলা। এ খামারের মাধ্যমে নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করে নিজেকে স্বাবলম্বী করতে চান তিনি। পাশাপাশি বিয়ে করে একটি সুন্দর সংসার গড়ে সমাজে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করতে চান। তাঁর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রাথমিক পুঁজি, পশু কেনার সহযোগিতা, খামার স্থাপনের উপযুক্ত ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।
রেজাউলের ছোট বোন শামীমা খাতুন বলেন, “জন্মের পর থেকেই আমার বড় ভাইকে এ অবস্থায় দেখে আসছি। তাঁর জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছি। এ কারণেই গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পরও অন্য কোনো চাকরিতে না গিয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছি। দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে কাজ করে যাচ্ছি। আমি চাই, রেজাউলের মতো মানুষগুলোও সমাজে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার সুযোগ পাক।”
রেজাউলের মা শেফালী বেগম বলেন, “আমার ছেলের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের যদি সমাজ একটু সুযোগ ও সহযোগিতা করে, তাহলে তারাও অনেক ভালো কিছু করতে পারে। আমার ছেলে ঘরের অনেক কাজ করতে পারে। খড়ি কাটা, গবাদিপশু পালন, রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন কাজে সে আমাদের সহযোগিতা করে। আমি চাই, আমার ছেলে নিজের মতো করে কিছু করুক, স্বাবলম্বী হোক এবং একটি সুন্দর জীবন গড়ে তুলুক।”
রেজাউলের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো মানুষের স্বপ্ন দেখার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। একজন মানুষের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারিত হয় তাঁর ইচ্ছাশক্তি, কর্মস্পৃহা ও সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত পরিবেশ, কর্মসংস্থানের সুযোগ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক সহযোগিতা।
রেজাউলের প্রত্যাশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষ তাঁর পাশে দাঁড়াবেন। বিশেষ করে গরু, ছাগল ও ভেড়ার একটি ছোট খামার গড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হলে নিজের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যতে পরিবারের দায়িত্বও নিতে পারবেন তিনি।
হয়তো কারও সামান্য সহযোগিতা রেজাউলের জীবনে বয়ে আনতে পারে নতুন সম্ভাবনা। তাঁর স্বপ্ন শুধু কয়েকটি গবাদিপশুর খামার গড়ে তোলা নয়; তাঁর স্বপ্ন নিজের উপার্জনে বাঁচা, আত্মমর্যাদা নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং বিয়ে করে ভালোবাসায় ভরা একটি সংসার গড়ে তোলা। সমাজের মানবিক মানুষগুলোর একটু সহযোগিতাই হতে পারে তাঁর স্বপ্নপূরণের প্রথম সিঁড়ি।